এর বিরম্নদ্ধে শুরম্ন থেকেই বাসদ-সহ বাম-প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দেশপ্রেমিক শক্তি প্রতিবাদ জানিয়ে আসছিল। আন্দোলনের ধারায় গঠিত হয় তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রÿা জাতীয় কমিটি। এর পর থেকে দীর্ঘ এক যুগের বেশি সময় ধরে ওই কমিটির নেতৃত্বে গ্যাসসম্পদ রÿার আন্দোলন চলছে। সিলেটের বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্র থেকে ভারতে গ্যাস রপ্তানির সিদ্ধান্ত্মের বিরম্নদ্ধে বিএনপি-জামাত জোট সরকার ÿমতায় আসার মাত্র দেড় মাসের মাথায় ১৫ নভেম্বর ২০০১ বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট ও অপরাপর বামপন্থী দলসমূহের ডাকে সারাদেশে অর্ধদিবস হরতাল, ২০০২ সালের ২ ফেব্রম্নয়ারি ১১ দলের ডাকে সারাদেশে অর্ধদিবস হরতাল পালন করা হয়। এরই এক পর্যায়ে জাতীয় কমিটির নেতৃত্বে ২০০৩ সালের ৬ থেকে ১৩ মার্চ ঢাকা-বিবিয়ানা ২৯০ কি.মি. রাস্ত্মা লংমার্চ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। আন্দোলনের চাপেই সেদিন গ্যাস রপ্তানির সিদ্ধান্ত্ম প্রতিহত করা সম্ভব হয়েছিল। একইভাবে জাতীয় কমিটির নেতৃত্বে আন্দোলনের চাপেই মার্কিন এসএসএ কোম্পানিকে বেসরকারি কন্টেইনার টার্মিনাল নির্মাণের অনুমতি দিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর ধ্বংস করার সরকারি চক্রান্ত্ম এবং দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত কয়লাখনি এবং কয়লা রপ্তানির সিদ্ধান্ত্ম প্রতিহত করা সম্ভব হয়েছিল।
বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে দেশের স্থলভাগের পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরের গ্যাসবস্নকগুলোও দেশের স্বার্থবিরোধী শর্তে রপ্তানির বিধান রেখে বিদেশি বহুজাতিক কোম্পানির হাতে তুলে দেয়ার অপতৎপরতা শুরম্ন হয়। দেশবাসীর প্রতিবাদ সত্ত্বেও বর্তমান আওয়ামী নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার গত ২৬ জুন '১১ মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানি কনোকো-ফিলিপসের কাছে সাগরের ১০ ও ১১ নম্বর গ্যাসবস্নক ইজারা চুক্তি করেছে। এর প্রতিবাদে গত ৩ জুলাই ঢাকায় হরতাল পালিত হয়েছে। এখন আমরা শুনতে পাচ্ছি দেশের একটি বৃহত্তম গ্যাসÿেত্র সুনেত্র-সহ গ্যাসসম্পদ নিয়ে নানা ধরনের চক্রান্ত্ম-ষড়যন্ত্রের কথা।
গ্যাসÿেত্রের নাম সুনেত্র কেন?
বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন প্রতিষ্ঠান বাপেঙ্ (বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এঙ্পেস্নারেশন এন্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লি.) আবিষ্কৃত নতুন গ্যাসÿেত্রের নাম সুনেত্র। ২০০৯-'১০ সালে বাপেঙ্ সুনামগঞ্জ-নেত্রকোনা জেলায় মোট ২৫৯ লাইন কিলোমিটার দ্বি-মাত্রিক ভূ-কম্পন জরিপ বা সিসমিক সার্ভের মাধ্যমে গ্যাসÿেত্রটি চিহ্নিত করে। সুনেত্র গ্যাসÿেত্র সুনামগঞ্জের ধরমপাশা উপজেলা এবং নেত্রকোনা জেলার বারহাট্টা উপজেলা জুড়ে বিস্ত্মৃত। এর বিস্ত্মৃতি মোহনগঞ্জ উপজেলা পর্যন্ত্ম হতে পারে। সম্ভাব্য কূপ খনন এলাকার নাম গাবী, যা সুনামগঞ্জ জেলার ধরমপাশা উপজেলার সেলবরশ ইউনিয়নের অন্ত্মর্গত। যেহেতু গ্যাসÿেত্রটি দুই জেলায় অবস্থিত, তাই সুনামগঞ্জের 'সু' ও নেত্রকোনার 'নেত্র' মিলিয়ে এর নামকরণ করা হয়েছে। এখানে যে গ্যাসকূপ খনন করা হবে তাদের নামকরণ করা হবে সুনেত্র-১, সুনেত্র-২ ইত্যাদি।
এ অঞ্চলটি গ্যাসবস্নক ১১ ও ১২ এর মধ্যে অবস্থিত। ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী এ এলাকাটি একটি গ্যাসসম্পদের সম্ভাবনাময় এলাকা। ছাতক গ্যাসÿেত্র থেকে ৫৯ কিমি দÿিণ-পশ্চিম এবং বিবিয়ানা গ্যাসÿেত্র থেকে ৬৯ কিমি উত্তর-পশ্চিমে সুরমা বেসিনের পশ্চিম প্রান্ত্মে সুনেত্র গ্যাসÿেত্রের অবস্থান। সুরমা বেসিনের পূর্বপ্রান্ত্মে বেশ কয়েকটি গ্যাসÿেত্র আবিষ্কৃত হলেও পশ্চিম প্রান্ত্মে কোনো গ্যাসÿেত্র প্রাপ্তি এটাই প্রথম। আনুমানিক ৩৭০০ মিটার গভীরতায় অবস্থিত এ গ্যাসÿেত্র বিবিয়ানা গ্যাসÿেত্রের সাথে তুলনীয়। কাছেই অবস্থিত বিবিয়ানা গ্যাসÿেত্রের সাথে তুলনা করে বাপেঙ্ এর সম্ভাব্য মজুদ নির্ধারণ করেছে ২.৪৭ ট্রিলিয়ন কিউবিক ফুট (টিসিএফ)। বিবিয়ানা গ্যাসÿেত্রের বেলায়ও প্রথমে বলা হয়েছিল সেখানে গ্যাস মজুদ ২.৫ টিসিএফ, কিন্তু সম্প্রতি আরো অনুসন্ধানের ফলে সে মজুদ এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ টিসিএফ। তাই বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, সুনেত্র-তে ৪ থেকে ৫ টিসিএফ গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই উজ্জ্বল। ইউনাইটেড স্টেটস জিওলজিক্যাল সার্ভে (টঝএঝ) ও পেট্রোবাংলা যৌথভাবে পরিচালিত পর্যবেÿণের ফলে ধারণা করা হচ্ছে এখানে ৮.১৪ টিসিএফ পর্যন্ত্ম গ্যাস থাকতে পারে। দেশে তীব্র গ্যাসসংকট, দ্রম্নত গ্যাস মজুদ ফুরিয়ে যাবে - এ ধরনের আশঙ্কা যখন সরকারি মহল থেকে প্রচার করা হচ্ছিল তখন সুনেত্র গ্যাসÿেত্র দেশের স্থলভাগে আরো গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনাকে দৃঢ় করলো।
গ্যাস মজুদের পরিমাণ অনুযায়ী সুনেত্র একটি বড় মাপের গ্যাসÿেত্র
বাংলাদেশে আবিষ্কৃত ২৩টি গ্যাসÿেত্রের মধ্যে ৯টিকে বড় গ্যাসÿেত্র হিসেবে ধরা হয়। যে সমস্ত্ম গ্যাসÿেত্রের মজুদ ১ টিসিএফ এর বেশি সেগুলো বড় গ্যাসÿেত্র হিসেবে চিহ্নিত। নতুন আবিষ্কৃত সুনেত্র এদের মধ্যে অন্যতম।
গ্যাসÿেত্র মোট মজুদ (সম্ভাব্য)
১. তিতাস ৪.১৩৮ টিসিএফ
২. হবিগঞ্জ ৩.৬৬৯,,
৩. কৈলাসটিলা ৩.৬৫৭,,
৪. রশিদপুর ৫,, (সম্প্রতি আবিষ্কৃত নতুন গ্যাস মজুদসহ)
৫. ছাতক ১.৯০০,,
৬. জালালাবাদ ১.৫০০,,
৭. বাখরাবাদ ১.৪৩২,,
৮. বিবিয়ানা ৪.৫০০,, (সম্প্রতি আবিষ্কৃত ২ টিসিএফ-সহ)
৯. সুনেত্র ২.৪৭,, (ভবিষ্যতে ৪ থেকে ৫ টিসিএফ হতে পারে)
সুনেত্র আবিষ্কার আবারো প্রমাণ করলো বাংলাদেশের প্রযুক্তিবিদরা গ্যাস আবিষ্কার ও উত্তোলনে সÿম
'তেল-গ্যাস অনুসন্ধান একটি জটিল ও উচ্চ কারিগরী দÿতার কাজ, বাংলাদেশের পÿে তা করা সম্ভব নয়' - সরকারি মহলের লাগাতার প্রচার থেকে এমন অবস্থা হয়েছে যে এ কথা সাধারণ মানুষ তো বটেই এমনকি শিÿিত মানুষরাও এটা বিশ্বাস করেন। আমাদের দল বাসদ এবং তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রÿা জাতীয় কমিটি দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে এটা শাসকশ্রেণীর লুটপাটের উদ্দেশ্যে একটি পরিকল্পিত অপপ্রচার। বিদেশি কোম্পানিকে লিজ দেয়া গ্রহণযোগ্য করার উদ্দেশ্যেই এ প্রচার চালানো হয়। যদিও বাস্ত্মব পরিস্থিতি পুরো উল্টো। সুনেত্র গ্যাসÿেত্র আবিষ্কার বাপেঙ্রে দÿতা ও যোগ্যতার সর্বশেষ প্রমাণ।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর দেশের তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের কাজে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। ১৯৭২ সালে দেশীয় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানী সংস্থা 'পেট্রোবাংলা' প্রতিষ্ঠিত হয়। তৎকালীন সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন পেট্রোবাংলা গঠনে পর্যাপ্ত আর্থিক ও কারিগরী সহায়তা প্রদান করেছিলো। এদেশের তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের ইতিহাসে পেট্রোবাংলার অভ্যুদয় এক বিশেষ ঘটনা, কারণ এই প্রথম বাংলাদেশের ভূ-তত্ত্ববিদ ও প্রযুক্তিবিদগণ উদ্যোগ নেয়ার ও দÿতা-যোগ্যতা প্রমাণ করার সুযোগ পান। এর আগে বড় গ্যাসÿেত্রগুলো যেমন রশিদপুর (১৯৬০), কৈলাসটিলা (১৯৬২), তিতাস (১৯৬২), হবিগঞ্জ (১৯৬৩) এবং বাখরাবাদ (১৯৬৮) এই পাঁচটি গ্যাসÿেত্র আবিষ্কার করেছিল ব্রিটিশ শেল অয়েল কোম্পানি।
পেট্রোবাংলা প্রথম অনুসন্ধান কূপ খনন করে ১৯৭৫ সালে নোয়াখালি জেলার বেগমগঞ্জে। পেট্রোবাংলার জন্মের এক দশকের মধ্যে সীমিত সামর্থ্য দিয়ে পাঁচটি গ্যাসÿেত্র আবিষ্কার করে বাংলাদেশের ভূ-তত্ত্ববিদ ও প্রকৌশলীরা তাদের দÿতা সাফল্যজনকভাবে প্রমাণ করেন। এ গ্যাসÿেত্রগুলো হলো ১৯৮০ সালে বেগমগঞ্জ, ১৯৮১ সালে ফেনী ও বিয়ানীবাজার, ১৯৮২ সালে কামতা এবং ১৯৮৭ সালে ফেঞ্চুগঞ্জ। গ্যাসÿেত্র ছাড়াও এদেশের তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের ইতিহাসে সবচেয়ে উলেস্নখযোগ্য ঘটনা ১৯৮৬ সালের ডিসেম্বর মাসে সিলেটের হরিপুরে দেশের প্রথম তেলÿেত্র আবিষ্কার যা পেট্রোবাংলার একক কৃতিত্ব। পরের বছর পেট্রোবাংলা ফেঞ্চুগঞ্জ কূপে তেল আবিষ্কার করে, যদিও তেল মজুদের পরিমাণ অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক নয় বলে জানানো হয়। ১৯৮৮ সালে কৈলাসটিলা কূপেও তেল পাওয়া যায়। এসব ছাড়াও ১৯৮৯ সালে বাপেঙ্ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এ প্রতিষ্ঠান সালদা নদী ও শাহবাজপুর গ্যাসÿেত্র আবিষ্কার করে সেখান থেকে গ্যাস উত্তোলন করছে। সম্প্রতি নোয়াখালির সুন্দলপুর থেকে পরীÿামূলক গ্যাস উত্তোলন, সেমুতাঙ গ্যাসÿেত্র থেকে উত্তোলন ও সরবরাহ, রশিদপুরে নতুন গ্যাস রিজার্ভ আবিষ্কার, বহুজাতিক কোম্পানি টালেস্নাকে ইজারা দেয়া গ্যাসÿেত্র লালমাই ও বাঙ্গুরায় সিসমিক সার্ভের কাজ করা, বাঙ্গুরায় ওয়াকওভার কূপ খননে সাফল্য, বিদেশি কোম্পানির তুলনায় অনেক কম খরচে কাজ করে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় - ইত্যাদি বিবেচনা করলে বাপেঙ্-পেট্রোবাংলার দÿতাকে অবমূল্যায়নের কোনো সুযোগ নেই।
এ ÿেত্রে একটি বিষয় আমাদের মনে রাখা দরকার। দেশের গ্যাসÿেত্রগুলো থেকে দেশীয় প্রতিষ্ঠান বাপেঙ্ এবং পেট্রোবাংলার মাধ্যমে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের দাবি আমরা জানাচ্ছি। কিন্তু বাপেঙ্ এবং পেট্রোবাংলা বিদ্যমান পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের অধীনস্থ প্রতিষ্ঠান। দুর্নীতি-লুটপাট-অপচয়-আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ইত্যাদি পুঁজিবাদী উপসর্গ থেকে এসব প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ মুক্ত এমন মনে করার কোনো কারণ নেই। এর সাথে আছে শাসকগোষ্ঠীর অব্যাহত চাপ। ফলে বাপেঙ্-পেট্রোবাংলাকে দুর্নীতি-অপচয়-লুটপাটের হাত থেকে মুক্ত করার দাবি যেমন আমাদের তুলতে হবে একই সাথে এসব প্রতিষ্ঠানের আপেÿিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, প্রযুক্তিবিদদের উন্নত প্রশিÿণ, বেতন-ভাতা ইত্যাদি নিশ্চিত করার জন্য রাষ্ট্রের ওপর চাপ তৈরি করতে হবে।
বাংলাদেশের ভূ-প্রকৃতি অনুযায়ী এদেশে গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই স্বাভাবিক
পূর্ব এশিয়ার দেশসমূহের মধ্যে গ্যাসসম্পদে বাংলাদেশের অবস্থান ৬ষ্ঠ। ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, চীন, ভারত, পাকিস্ত্মান এর পরেই বাংলাদেশের অবস্থান। (যদিও বাংলাদেশের আয়তন ওইসব দেশের তুলনায় অনেক ছোট এবং অনেক অঞ্চলেই এখনো অনুসন্ধান কাজ চালানো হয়নি। বিদেশি কোম্পানিগুলোকে এক যুগ আগে লিজ দেয়া অনেক গ্যাসবস্নকে অনুসন্ধান কাজ বন্ধ করে রাখা হয়েছে।) কিন্তু বাংলাদেশের ভূ-তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী এখানে গ্যাস পাওয়া খুবই স্বাভাবিক। বাংলাদেশ পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ। বাংলাদেশ ব-দ্বীপ এলাকাটি গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র নদী বাহিত পলি দ্বারা গঠিত। হিমালয় পর্বতমালায় সৃষ্ট এ নদী দুটি সম্মিলিতভাবে প্রায় ১০০ কোটি টন পলি প্রতি বছর বহন করে বঙ্গোপসাগরে জমা করে এবং এর পরিমাণ পৃথিবীর যে কোনো নদী দ্বারা বাহিত পলির পরিমাণের চেয়ে বেশি। এর ফলে এ এলাকায় কেবলমাত্র পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম ব-দ্বীপ সৃষ্টি হয়নি বরং বাংলাদেশের উপকূল ছাড়িয়ে দÿিণে বঙ্গোপসাগরের তলদেশেও বিশাল পলির স্ত্মর জমা হয় যা পৃথিবীর বৃহত্তম 'বেঙ্গল ডিপ সী ফ্যান' হিসেবে পরিচিত।
তেল ও গ্যাসের সৃষ্টি এবং অবস্থানের প্রাথমিক শর্ত হলো কোনো এলাকায় পাললিক শিলার পুরম্নত্ব। কারণ তেল-গ্যাস পাললিক শিলাস্ত্মরেই সৃষ্টি ও জমা হয়ে থাকে। দেশের উত্তর-পূর্বাংশে সিলেট বেসিন অঞ্চলে সর্বোচ্চ প্রায় ২০ কিমি পুরম্ন এবং দÿিণে উপকূল এলাকার সমুদ্র সীমানায় ভূ-অভ্যন্ত্মরে সর্বোচ্চ প্রায় ২২ কিমি পুরম্ন পাললিক শিলাস্ত্মরের সঞ্চয় ঘটেছে। বাংলাদেশের ভূ-অভ্যন্ত্মরে পাললিক শিলাস্ত্মরের যে বিশাল পুরম্নত্ব তা তেল-গ্যাস সম্ভাবনার প্রাথমিক শর্ত পূরণ করে। পৃথিবীর একাধিক ব-দ্বীপ এলাকা এ কারণেই তেল-গ্যাসে সমৃদ্ধ। নাইজেরিয়ার নাইজার ব-দ্বীপ, ইন্দোনেশিয়ার মহাকাম ব-দ্বীপ, উত্তর আমেরিকার মিসিসিপি ও ম্যাকেঞ্জি ব-দ্বীপ এলাকা ও ভারতের আসাম রাজ্যের প্রাচীন ব-দ্বীপের নাম এÿেত্রে উলেস্নখ করা যায়। বাংলাদেশেও সিলেট অঞ্চলে গ্যাস-তেল প্রাপ্তির সাফল্যের অনুপাত উচ্চ, ১: ১.৭ অর্থাৎ দুইটি কূপ খনন করলে একটিতে গ্যাস পাওয়া যায়। বাংলাদেশে বড় গ্যাসÿেত্রগুলোও সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, কুমিলস্না, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এলাকাতেই। দেশের হাওর অঞ্চলও এ এলাকা জুড়েই। ফলে শুধু সুনেত্র নয়, হাওর অঞ্চলে আরও গ্যাস-তেল ÿেত্র পাওয়ার সম্ভাবনা ভূ-তাত্ত্বিকভাবেই উজ্জ্বল।
সুনেত্র গ্যাসÿেত্র নিয়ে বাপেঙ্রে প্রস্ত্মাবনা এবং সরকারের ভূমিকা
গত ২৬ জুলাই জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত 'সুনামগঞ্জ-নেত্রকোনা (সুনেত্র) ভূ-গঠনের ভূ-তাত্ত্বিক মূল্যায়ন'-এর ওপর কারিগরী সভায় বাপেঙ্রে পÿ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সুনামগঞ্জ-নেত্রকোনা জেলার মধ্যবর্তী অঞ্চলে একটি বিশেষ সম্ভাবনাময় ভূ-গঠন প্রাপ্তির ঘোষণা দেয়া হয়। সভায় সিদ্ধান্ত্ম হয় - (১) ডিপিপি (প্রকল্প উন্নয়ন প্রস্ত্মাব) চূড়ান্ত্ম করে মার্চ-এপ্রিল ২০১১ এর মধ্যে সুনেত্র অনুসন্ধান কূপ নং ১ খননের সকল কার্য়ক্রম গ্রহণ করা (চযধংব-১); (২) গ্যাস আবিষ্কৃত হলে একই ডিপিপি-র অধীনে দ্বিতীয় পর্যায়ের (চযধংব-২) কার্যক্রম হিসেবে তিনটি উৎপাদন কূপ খনন করা এবং প্রসেস পস্ন্যান্ট ও পাইপ লাইন স্থাপন করা।
ওই নির্দেশনার আলোকে ২০ অক্টোবর ২০১০ বাপেঙ্রে পরিচালকম-লীর সভায় সুনেত্র গ্যাসÿেত্র উন্নয়নের জন্য প্রথম পর্যায়ে একটি অনুসন্ধান কূপ খনন ও পরীÿণের জন্য 'গ্যাস ডেভেলপমেন্ট ফান্ড' থেকে ৭৯ কোটি টাকা এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে ৩টি উন্নয়ন কূপ খননের জন্য একই উৎস হতে ২০০ কোটি টাকা অর্থাৎ সর্বমোট ২৭৯ কোটি টাকার একটি উবাবষড়ঢ়সবহঃ চৎড়লবপঃ চৎড়ঢ়ড়ংধষ বা ডিপিপি অনুমোদন করা হয় এবং মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের জন্য পেট্রোবাংলায় প্রেরণ করা হয়। পেট্রোবাংলার নির্দেশনার আলোকে ডিপিপি-র কিছু সংশোধন করে ফেব্রম্নয়ারি ২০১১-তে অনুমোদনের জন্য বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হয়। ডিপিপি-তে যে ২৭৯ কোটি টাকার হিসেব দেয়া হয়েছে তা অবশ্য একবারে লাগবে না, মোট ৪টি অর্থবছরে বিভিন্ন পর্যায়ে এই বরাদ্দের প্রয়োজন হবে। এর মধ্যে প্রথম পর্যায়ের কাজের জন্য (চযধংব-১) ২০১০-'১১ অর্থবছরে ৫৯ কোটি ৬৬ লাখ টাকা, ২০১১-'১২ অর্থবছরে ১৯ কোটি ৩৩ লাখ টাকা এবং দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজের জন্য (চযধংব-২) ২০১২-'১৩ অর্থবছরে ১২৩ কোটি ৮৬ লাখ টাকা, ২০১৩-'১৪ অর্থবছরে ৭৬ কোটি ১৪ লাখ টাকা। পুরো কাজের জন্য ৪ বছরে এ বরাদ্দ চাওয়া হয়েছিল।
বাপেঙ্রে ডিপিপি অনুসারে সুনেত্র গ্যাসÿেত্রের প্রথম পর্যায়ের অনুসন্ধান কূপ খনন ও আনুষঙ্গিক কাজ ২০১০/২০১১ সালের জুলাই মাসে শুরম্ন হয়ে ২০১২ সালের জুন মাসে শেষ হওয়ার কথা। দ্বিতীয় পর্যায়ের ৩টি উন্নয়ন কূপ খননের কাজ ২০১১/২০১২ সালের জুলাই মাসে শুরম্ন হয়ে ২০১৪ সালের জুন মাসে শেষ হওয়ার কথা। দ্বিতীয় পর্যায়ের শেষের দিকে ২০১৪ সালের মে মাসের মধ্যে অন্ত্মত ১০০ মিলিয়ন কিউবিক ফুট বা ১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রীডে যুক্ত করার কথা বলেছিল বাপেঙ্। কিন্তু এই কাজ সময় মতো শেষ হওয়ার প্রধান শর্ত সময় মতো টাকা পাওয়া। বাপেঙ্ গ্যাস ডেপেলপমেন্ট ফান্ড থেকে ডিপিপি'র জন্য অর্থ বরাদ্দের কথা উলেস্নখ করেছিল। পত্রিকায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী গ্যাস ডেভেলপমেন্ট ফান্ডে ১০০০ কোটি টাকা থাকার কথা। ফলে সুনেত্র গ্যাসÿেত্রের জন্য ৪ বছরে ২৭৯ কোটি টাকা দেওয়া কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। কিন্তু বাস্ত্মব ঘটনা হচ্ছে বাপেঙ্রে ডিপিপি'টি বাতিল করে দেয়া হয়েছে। তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে কারখানায় গ্যাস সংযোগ দেয়া হচ্ছে না, বাড়িঘরে নতুন গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া যাচ্ছে না বলে প্রধানমন্ত্রী যখন বক্তব্য রাখছেন, ৮-১০ বছর পরে গ্যাস পাওয়া যাবে এটা জেনেও সমুদ্রের গ্যাসবস্নক ইজারা দেয়া হচ্ছে, ঠিক একই সময়ে ২৭৯ কোটি টাকা বিনিয়োগ করলে প্রতিদিন ১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া সম্ভব যে সুনেত্র গ্যাসÿেত্রে তার জন্য টাকা বরাদ্দ করা হচ্ছে না।
বাপেঙ্-এর প্রস্ত্মাব বাতিল ও দীর্ঘসূত্রতা
বিদেশি কোম্পানির সাথে নতুন পিএসসি'র পদধ্বনি
গ্যাস উন্নয়ন তহবিল-এর আওতায় বাপেঙ্ কর্তৃক বাস্ত্মবায়নের উদ্দেশ্যে প্রণীত ্তুঝঁহধসমড়হল-ঘবঃৎড়শড়হধ (ঝঁহবঃৎড়) ঙরষ/এধং ঊীঢ়ষড়ৎধঃড়ৎু ডবষষ উৎরষষরহম চৎড়লবপঃ্থ শীর্ষক প্রকল্পের ডিপিপি বিবেচনার জন্য ৬ জুলাই ২০১১ আন্ত্মঃমন্ত্রণালয় সভায় বাপেঙ্ পেশ করেছিল। কিন্তু বাপেঙ্রে ডিপিপি'র অনুমোদন দেয়া হয়নি। তখন সিদ্ধান্ত্ম নেয়া হয় যে প্রথম পর্যায়ের চযধংব-১ এর জন্য আলাদা ডিপিপি করে পুনরায় প্রেরণ করতে হবে। এখন প্রশ্ন হল, বাপেঙ্রে করা ডিপিপি থেকে চযধংব-২ বাদ দিয়ে শুধু চযধংব-১ এর একটি নতুন ডিপিপি করার উদ্দেশ্য কি?
আশঙ্কা ও গুঞ্জণ উঠেছে, চযধংব-২ এর ৩টি উন্নয়ন কূপ খননের কাজ রাশিয়ান কোম্পানি গ্যাজপ্রম (এধুঢ়ৎড়স) এর কাছে কন্ট্রাক্ট দেয়ার প্রস্তুতি চলছে। ইতোমধ্যে পেট্রোবাংলা 'ফাস্ট ট্র্যাক প্রোগ্রাম'-এর আওতায় কোনোরকম দরপত্র ছাড়াই গ্যাজপ্রমকে ১০টি কূপ খননের প্রস্ত্মাব দিয়েছিল। আর গ্যাজপ্রম প্রতিটি কূপ খননে রিগের ভাড়া ও খনন কাজের জন্য দাবি করেছে ১৪৫.৭৮ কোটি টাকা, যার সাথে সরঞ্জামসহ আনুষঙ্গিক ব্যয় যুক্ত হয়ে খরচ দাঁড়াবে কূপ প্রতি প্রায় ১৮০ কোটি টাকা। অথচ একটি কূপ খনন করতে বাপেঙ্-এর ৭০-৮০ কোটি টাকার বেশি লাগে না। যেমন, মোবারকপুর অনুসন্ধান কূপ খননে বাপেঙ্রে ব্যয় ৮৯.২৬ কোটি টাকা, শ্রীকাইল-২ এ ৮১.১২ কোটি টাকা, সুন্দলপুর কূপে ৭৩.৬৫ কোটি টাকা এবং কাপাসিয়া কূপে ৭০.১৭ কোটি টাকা। বাপেঙ্রে প্রস্ত্মাবিত ডিপিপি'র চেয়ে খরচ কম হওয়ারও নজির আছে (যেমন সম্প্রতি আবিষ্কৃত সুন্দলপুরের প্রস্ত্মাবিত খরচ ৭৩.৬৫ কোটি টাকা ধরা হলেও প্রকৃত খরচ ৫০ কোটি টাকা অতিক্রম করেনি)। বাপেঙ্রে নিজস্ব জনবল ব্যবহার করে এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করে কাজ করার এমন নজির থাকার পরও কেন বিদেশি কোম্পানিকে ডাকা হবে?
বিদেশি কোম্পানিগুলো সিসমিক সার্ভে থেকে শুরম্ন করে অনুসন্ধান ও উত্তোলন কূপ খনন সকল ধাপেই কয়েকগুণ বাড়তি অর্থ আদায় করে। যেমন, প্রতি লাইন কিমি দ্বি-মাত্রিক ভূ-কম্পন জরিপ বা সিসমিক সার্ভের জন্য বিদেশি কোম্পানি গড়ে খরচ দেখায় ৬ লাখ ৫৩ হাজার টাকা, বাপেঙ্ সেখানে খরচ করে গড়ে ১ লাখ টাকা। সুনেত্র গ্যাসÿেত্রের বেলায় ২৫৯ লাইন কিমি দ্বি-মাত্রিক সার্ভের জন্য বাপেঙ্রে মোট খরচ হয়েছে ৩.৫ কোটি টাকা অর্থাৎ প্রতি লাইন কিমি-এ খরচ ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। বিদেশি কোম্পানিকে দিয়ে এ কাজ করতে হলে কমপÿে ১৭ কোটি টাকা লাগতো। বাপেঙ্ কর্তৃক আবিষ্কার, প্রাথমিক মজুদ নির্ণয়, অনুসন্ধান ও উন্নয়ন কূপ খনন, গ্যাস উত্তোলন ও সরবরাহ করার সামগ্রিক ব্যয় ও পরিকল্পনা পেশ করার পরও দীর্ঘসূত্রতা তাই এক নতুন আশঙ্কার জন্ম দিচ্ছে। নতুন উৎপাদন বণ্টন চুক্তি (পিএসসি) করে গ্যাজপ্রম বা অন্য কোনো বিদেশি কোম্পানিকে এ বিশাল ও অবস্থানগত দিক থেকে গুরম্নত্বপূর্ণ গ্যাসÿেত্র ইজারা দেয়ার চক্রান্ত্ম চলছে।
বিদেশি কোম্পানিকে ইজারা দেয়ার ফলাফল কি?
১৯৯৩ সালে বিএনপি সরকারের আমলে বিদেশি কোম্পানির কাছে ৮টি বস্নক তুলে দেয়া হয়। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের আমলে আরও ৪টি গ্যাসবস্নক বিদেশি কোম্পানির কাছে ইজারা দেয়া হয়।
সরকার কোম্পানির নাম গ্যাসবস্নক
বিএনপি কেয়ার্ন এনার্জি - হল্যান্ড সী সার্চ বস্নক ১৫,১৬
অঙ্েিডন্টাল বস্নক ১২,১৩,১৪
অকল্যান্ড রেঙ্উড বস্নক ১৭,১৮
ইউনাইটেড মেরিডিয়ান কর্পোরেশন বস্নক ২২
আওয়ামী লীগ শেল-কেয়ার্ন এনার্জি বস্নক ৫,১০
টালেস্না, শেভরন, টেঙ্াকো বস্নক ৯
ইউনোকল বস্নক ৭
এসব গ্যাসÿেত্র ইজারা দেয়ার ফল কি হয়েছে? গ্যাসের দাম বাড়ছে দফায় দফায়। কারণ উৎপাদন বণ্টন চুক্তি অনুযায়ী গ্যাসের ৭৯% পাবে বিদেশি কোম্পানি আর ২১% পাবে বাংলাদেশ। বিদেশি কোম্পানির ৭৯% গ্যাস বাংলাদেশকে কিনতে হয় আন্ত্মর্জাতিক বাজার দরে, তাদের কর্পোরেট ট্যাঙ্ পরিশোধ করতে হয় পেট্রোবাংলাকে। বিদেশি মুদ্রায় কোম্পানির কাছ থেকে গ্যাস কিনতে হয় বলে গার্মেন্টস শ্রমিক আর প্রবাসী শ্রমিকদের কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রার ভা-ারে টান পড়ে। বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে যে গ্যাস আমরা কিনি তার দাম প্রতি হাজার ঘনফুট ২৫ টাকা, কিন্তু বিদেশি কোম্পানির কাছ থেকে কিনতে হয় ৩ ডলার (যা বর্তমানে ২৩৫ টাকা) দামে। এ দামের সমন্বয় করতে গিয়ে প্রতি বছর ভর্তুকি দিতে হয় ২৫০০ কোটি টাকা।
পুঁজির অভাবের কথা বলে যত বিদেশি কোম্পানি ডেকে আনা হচ্ছে তত দেশের টাকা পাচার হচ্ছে। ভর্তুকি কমানোর কথা বলে সরকার প্রতি বছর কমপÿে ২ বার গ্যাসের দাম বাড়াচ্ছে। গ্যাস দিয়ে বিদ্যুৎ, সিএনজি, সার ইত্যাদি তৈরি হয়। তাই বিদ্যুতের দাম বাড়ে, বিদ্যুতের দাম বাড়লে কারখানার উৎপাদন খরচ বাড়ে, গৃহস্থালির ব্যয় বাড়ে। সারের দাম বাড়লে কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়ে। সিএনজির দাম বাড়লে পরিবহন খরচ বাড়ে, তাই যাত্রী-মালামাল পরিবহন সবÿেত্রে ভাড়া বাড়ে। অর্থাৎ খরচ বাড়ে জনগণের আর লাভ বাড়ে বিদেশি কোম্পানির।
বিদেশি কোম্পানি বাংলাদেশে জনগণের সেবা করতে আসে না, তারা আসে মুনাফা করতে। এই মুনাফার জন্য বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, জাতীয় সম্পদ কিংবা পরিবেশের ভারসাম্য বিনষ্ট করতেও তাদের বাধে না। তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হল মার্কিন অঙ্েিডন্টাল ও কানাডীয় নাইকোর মতো 'উন্নত প্রযুক্তি' সম্পন্ন কোম্পানি মাগুরছড়া ও টেংরাটিলায় দুর্ঘটনা ঘটিয়ে কত বড় সর্বনাশ করেছে। এদের দ্বারা ধ্বংস হলো গ্যাসÿেত্র, পুড়ে গেল বহুমূল্য গ্যাস আর পরিবেশের অপূরণীয় ÿতি হলো। ব্রিটিশ কোম্পানি কেয়ার্ন এনার্জি সমুদ্রের গ্যাসÿেত্র সাংগু থেকে নিরাপদ সীমার বেশি গ্যাস তড়িঘড়ি করে তুলতে গিয়ে গ্যাসÿেত্রের কাঠামো ও উৎপাদনÿমতা নষ্ট করে দিল। অথচ পুরাতন যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজ করলেও বাপেঙ্ কিংবা পেট্রোবাংলা এ ধরনের ঘটনা এখনো ঘটায়নি।
ইতোমধ্যে ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১০ জ্বালানি মন্ত্রণালয় কেয়ার্ন এনার্জি ও হেলিবার্টনের সাথে একটি চুক্তি স্বাÿর করেছে। তৃতীয় পÿের কাছে গ্যাস বিক্রির অনুমতি দিয়ে স্বাÿরিত এ চুক্তি আর এক সর্বনাশের দ্বার উন্মোচন করেছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলার কাছে গ্যাস বিক্রির যে বাধ্যবাধকতা বিদেশি কোম্পানির ছিল তা আর থাকবে না, বিদেশি কোম্পানির কর্তৃত্ব আরো বাড়বে। অন্যান্য বিদেশি কোম্পানিগুলোও এ ধারা অনুসরণ করতে চাইবে। ফলে দেশের গ্যাস দেশের অভ্যন্ত্মরে ইচ্ছেমতো দামে বেসরকারি ও বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি বা রপ্তানির সুযোগ পাবে বিদেশি কোম্পানিগুলো। দেশের গ্যাস সংকট তাহলে মিটবে কীভাবে? সংকট মেটানোর কথা বলে যত বিদেশি কোম্পানিকে গ্যাসÿেত্র ইজারা দেয়া হচ্ছে ততই গ্যাসের দাম বাড়ছে, এখন গ্যাস রপ্তানির ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতেও গ্যাস সংকট মেটানো সম্ভব, প্রয়োজন পরিকল্পনা ও যথাযথ বাস্ত্মবায়ন
দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা ২৩০ কোটি ঘনফুট। উৎপাদন হচ্ছে ১৯০ থেকে ১৯৮ কোটি ঘনফুট। ঘাটতি থাকে ৩৫ কোটি ঘনফুট। স্বল্পমেয়াদী পরিকল্পনার আওতায় ২০০৯ সালে ৪টি কূপের ওয়ার্কওভার এবং ফেনী গ্যাসÿেত্রের ২টি উন্নয়ন কূপ খনন করে দৈনিক ১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদনের লÿ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। বাখরাবাদ গ্যাসÿেত্রে আরও ২টি নতুন কূপ চালু করার মাধ্যমে ২ কোটি, তিতাস গ্যাসÿেত্রের ১৪ নং কূপ থেকে আড়াই কোটি ঘনফুট, মেঘনা-১ থেকে দেড় কোটি ঘনফুট এবং নাইকো পরিচালিত ফেনী গ্যাসÿেত্র থেকে ৪ কোটি ঘনফুট অর্থাৎ সর্বমোট দৈনিক ২০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা ছিল। আর মধ্যমেয়াদী পরিকল্পনার আওতায় ৫টি উন্নয়ন কূপ, ৪টি ওয়ার্কওভার কূপ এবং ৪টি অনুসন্ধান কূপ খনন করে ২০১১ সালের নবেম্বর মাসের মধ্যে অন্ত্মত ১৩টি কূপ থেকে দৈনিক ২৮ কোটি ঘনফুট গ্যাস অতিরিক্ত উৎপাদনের লÿ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল।
কিন্তু এসব পরিকল্পনার অধিকাংশই কাগজের পাতায় রয়ে গেছে, বাস্ত্মবায়নের মুখ দেখেনি। শুধুমাত্র তিতাস গ্যাসÿেত্র থেকে দৈনিক অতিরিক্ত দেড় কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ হলে প্রতিদিন অতিরিক্ত ৪৮ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সংযুক্ত হতো। এছাড়াও সেমুতাং গ্যাসÿেত্র থেকে দৈনিক দেড় কোটি ঘনফুট এবং নোয়াখালির সুন্দলপুর গ্যাসÿেত্র থেকে দৈনিক ১.২ থেকে ১.৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এ হিসেব অনুযায়ী গ্যাসের ঘাটতি থাকার কথা নয়, কিন্তু বাস্ত্মবে ঘাটতি থাকছে। এটাই রহস্য! এখন উপরে উলেস্নখিত স্বল্প ও মধ্য মেয়াদী পরিকল্পনার যথাযথ বাস্ত্মবায়ন হলে এবং আগামী ২/৩ বছরের মধ্যে সুনেত্র থেকে গ্যাস উত্তোলন শুরম্ন হলে দেশের স্থলভাগের গ্যাস দিয়ে যদি দেশের প্রয়োজন মিটে যায় তখন সমুদ্রবÿের গ্যাস রপ্তানি করার নতুন যুক্তি হাজির করা হবে।
খনিজ সম্পদ নিয়ে সবদেশেই চুক্তি হয়, বাংলাদেশও করছে - এ যুক্তি কতটা গ্রহণযোগ্য?
কোনো দেশের সম্পদের মালিক কারা? কাদের স্বার্থে দেশের সম্পদ ব্যবহার করা হবে? ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কি রেখে যাওয়া হবে? - এসব প্রশ্নের উত্তর এর সাথে যুক্ত আছে গ্যাস-তেল-খনিজসম্পদ নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা এবং বিদেশি কোম্পানির সাথে চুক্তি করার বিষয়। যেÿেত্রে আমাদের দেশ নিজস্ব পুঁজি ও প্রযুক্তি দিয়ে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন করতে সÿম সেÿেত্রে বিদেশের উদাহরণ টেনে আনার উদ্দেশ্য কি? আর পৃথিবীর সব দেশ কি একরকমভাবে জ্বালানিসম্পদ নিয়ে চুক্তি করে? বিভিন্নদেশের উদাহরণ বিভিন্নরকম। এটা কয়েকভাগে ভাগ করা যায় :
আমেরিকা : আমেরিকা বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজের দেশের মাটির নিচে গ্যাস-তেল-কয়লা মজুদ রেখে দিয়ে সারা দুনিয়ার বিভিন্ন দেশের তেল-গ্যাস লুণ্ঠন করার জন্য উঠে-পড়ে লেগেছে। আমেরিকা তেলের জন্য যুদ্ধ করতে দ্বিধা করে না। এ দেশটি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর জ্বালানি সম্পদের ওপর কর্তৃত্ব করছে, ইরাক-আপগানিস্ত্মান দখল করে সম্প্রতি লিবিয়ার ওপর আক্রমণ চালিয়েছে। ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, কানাডা, ভারত এগুলো আমেরিকার মতো একই ধরনের রাষ্ট্র।
চীন, মালয়েশিয়া : এরা নিজের দেশের জ্বালানি সম্পদের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে, নিজস্ব প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে। এখন অন্যান্য দেশেও তেল-গ্যাস অনুসন্ধান-উত্তোলন করার চেষ্টা করছে।
আফ্রিকার দেশসমূহ : সারা পৃথিবীর মধ্যে প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য কোথায়? এক কথায় উত্তর - আফ্রিকা। পৃথিবীর সবচেয়ে দারিদ্র্য, অপুষ্টি, রোগ, জাতিগত দাঙ্গা ও স্বৈরশাসন কবলিত অঞ্চল কোনটি? এ ÿেত্রেও উত্তর - আফ্রিকা। কেন এমন হলো? কেন সম্পদ থেকেও এসব দেশের মানুষ উন্নত জীবন পেল না? তার উত্তর - বিদেশি কোম্পানির সাথে অসম চুক্তি। নাইজেরিয়া বিপুল তেল রপ্তানি করছে, কিস্তু তার দেশে তেলের জন্য, খাদ্যের জন্য হাহাকার। এসব দেশ পরিচালিত হয় একদল দুর্নীতিবাজ স্বৈরশাসক দ্বারা। তেলের টাকায় অল্প কিছু মানুষের জীবনে সমৃদ্ধি আসে, বাকীদের জীবনে অন্ধকার। আরেকটি উদাহরণ কঙ্গো। কাজেই সম্পদ থাকলেই কোনো দেশ উন্নত হয় না - আফ্রিকার দেশগুলোর দিকে তাকালেই তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ভেনিজুয়েলা, বলিভিয়া : এসব দেশের অবস্থা আফ্রিকার দেশগুলোর মতই ছিল। বিদেশি কোম্পানির হাতে ছিল তেল-গ্যাস-তামা-লোহা-টিনসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক সম্পদের মালিকানা। সম্পদ যত উত্তোলন হত দারিদ্র্যও যেন ততই বাড়তো। জনগণের প্রতিরোধ শক্তি গড়ে তুলে আজ তারা পুরনো সব চুক্তি হয় বাতিল করেছে অথবা দেশের স্বার্থ রÿা করে নতুন চুক্তি করেছে।
কাজেই আমাদের সিদ্ধান্ত্ম নিতে হবে আমরা দৃষ্টান্ত্ম হিসেবে কাদের অনুসরণ করব? নাইজেরিয়া-কঙ্গোর ভাগ্য বরণ করব না ভেনিজুয়েলা-বলিভিয়ার পথে হাঁটবে? সবাই চুক্তি করে এ যুক্তি নয়, আমাদের সÿমতা ও জনগণের প্রয়োজন বিবেচনা করেই পদÿেপ নিতে হবে।
জাতীয় সম্পদ রÿার আন্দোলনকে শাসক-বিরোধী লড়াইয়ে পরিণত করম্নন
কেন অব্যাহত প্রতিবাদ সত্ত্বেও বার বার দেশের গ্যাসসম্পদ বিদেশি বহুজাতিক লুটেরাদের হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে? দেশের স্বার্থ, দেশের প্রয়োজন, দেশপ্রেম ইত্যাদি দোহাই দিয়েই কিন্তু এ কাজ করা হচ্ছে।
আমাদের মনে রাখা দরকার দেশ কথাটার কোনো অখ- মানে নেই। শাসকশ্রেণীর কাছে মুষ্টিমেয় ধনিকশ্রেণীর স্বার্থই দেশের স্বার্থ। জনগণের প্রয়োজন এবং স্বার্থ তাদের কাছে কোনো অর্থ বহন করে না। আমাদের দেশের বুর্জোয়া শাসকগোষ্ঠীর লÿ্য হল ধনিকশ্রেণীর লুটপাটকে নির্বিঘ্ন করা এবং ঝুঁকিবিহীন তাৎÿণিক মুনাফা নিশ্চিত করা। এখন কুইক রেন্টালের নামে বিদ্যুৎ ব্যবসায়ীদের জন্য গ্যাস দরকার, গার্মেন্ট মালিক, কারখানার মালিক, কোটি কোটি টাকায় বানানো ফ্ল্যাট বাড়ির মালিক - সবারই গ্যাস চাই। তাদের দাবি, যে-কোনো মূল্যে গ্যাস দিতে হবে। দেশের অভ্যন্ত্মরে বিদ্যুৎ-জ্বালানির ব্যবহার যত বাড়ছে ততই গ্যাসের চাহিদাও বাড়ছে। তাদের প্রয়োজন মেটাতে দ্রম্নত গ্যাস পেতে অসম শর্তে হলেও বিদেশি কোম্পানির সাথে চুক্তি করার কোন বিকল্প নেই এটাই শাসকগোষ্ঠী দেখাতে চায়। এর সাথে দুর্নীতিবাজ মন্ত্রী-আমলাদের বিরাট অংকের ঘুষ লেনদেন তো আছেই। দেশের অর্থাৎ জনগণের স্বার্থে এবং প্রয়োজনে দীর্ঘমেয়াদী কোনো পরিকল্পনা গ্রহণ, সে কাজে অর্থ বিনিয়োগ করা এবং প্রয়োজনে ঝুঁকি নেয়ার মানসিকতা আজকের যুগের বুর্জোয়ারা আর ধারণ করে না। আবার মুনাফার আশায় সে বিদেশের বাজারেও ঢুকতে চায়। বাজার নিয়ে এই ভাগ-বাঁটোয়ারার প্রশ্নে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর সাথে তাকে আপস করতে হয়।
গত ৪০ বছরে দেশের সম্পদ লুটপাট করেই ৩০ হাজার কোটিপতির জন্ম হয়েছে। তাদের স্বার্থেই সমস্ত্ম পরিকল্পনা প্রণীত হয়, অর্থ বিনিয়োগ করা হয়। এতে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগই শুধু বাড়ে। দ্রব্যমূল্য বাড়ে, বাড়ি ভাড়া-গাড়ি ভাড়া বাড়ে, শিÿা-চিকিৎসার খরচ বাড়ে। পালস্না দিয়ে বাড়ে মালিকদের মুনাফা আর লাভের পাহাড়। সমুদ্রের গ্যাসবস্নক ইজারা দেয়া অথবা স্থলভাগের গ্যাস-কয়লা নিয়ে চুক্তি করা ওই লুণ্ঠন প্রক্রিয়ারই অংশ। দেশের সম্পদ লুটপাট হবে, মুনাফাশিকারীদের হাতে কোটি কোটি মানুষ জিম্মি হবে, সব হারিয়ে নিঃস্ব মানুষ অদৃষ্টকে দায়ী করে আর্তনাদ করবে - এট কি চলতে পারে? তেল-গ্যাস-কয়লা রÿার সংগ্রামকে শক্তিশালী করা আজ প্রতিটি সচেতন দেশপ্রেমিক মানুষের দায়িত্ব। তাই আসুন, পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী লুণ্ঠন-লুটপাট রম্নখে দাঁড়াই। গ্যাসসম্পদসহ জাতীয় সম্পদ রÿার লড়াইকে শোষণমূলক পুঁজিবাদী ব্যবস্থা এবং শোষক পুঁজিপতিশ্রেণী-বিরোধী লড়াইয়ে পরিণত করি।











